৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  রাত ২:৫৮  ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
২৩শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

সব আসামিকে হাতকড়া পরানো আবশ্যক নয়

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পুলিশকে দিয়েছে। আদালতের পরোয়ানা বলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়। সব ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তার মানে হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর গ্রেপ্তারকারী কর্তৃপক্ষের শারীরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সে জন্য তাকে হাতকড়া পরানোর প্রয়োজন হতে পারে।

তবে অপরাধীর ধরনের ওপর নির্ভর করে পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়। আসামির সামাজিক অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করতে হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। তাঁকে আদালতে নেওয়া, আদালতের নির্দিষ্ট জেলহাজতে পাঠানো কিংবা পুলিশি হেফাজতে (রিমান্ড) আনা-নেওয়া করতে হয়। কীভাবে তা করতে হবে, তা পুলিশ প্রবিধানে উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ আছে, দুর্ধর্ষ প্রকৃতির আসামিদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে হাতকড়া (হ্যান্ডকাফ) পরাতে হবে। হাতকড়া কখনো দুজন আসামির দুই হাতে এক সেট পরানো হয়। কখনো একজনেরই দুই হাতে এক সেট। ক্ষেত্রবিশেষে হাত দুটো পেছন দিকে নিয়ে হাতকড়া পরানো হয়। আবার অনেককে গাড়িতে চড়িয়ে খোলা হাত–পায়ে করা হয় আনা-নেওয়া। ব্যাপারটি অনেকটা পুলিশের ইচ্ছার বিষয়। তবে ইচ্ছাটার যৌক্তিক ভিত্তি থাকা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায় না। সেটা হয় পীড়াদায়ক। কেননা, কাউকে হাতকড়া পরালে তিনি নিগৃহীত বিবেচ্য হন। তাই এখানে বিবেচনাবোধকে গুরুত্ব দেওয়া সংগত।

তুচ্ছ ও অনির্ভরযোগ্য অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি, যিনি গ্রেপ্তার এড়াতে শক্তি প্রয়োগ করবেন না, যাঁর সামাজিক মর্যাদা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদেরও কখনো কখনো হাতকড়া পরাতে দেখা যায়।

সম্প্রতি শফিকুল ইসলাম কাজল নামের এক সাংবাদিক, যিনি ৫৪ দিন আগে ঢাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন, আকস্মিকভাবে তাঁকে যশোরে ‘পাওয়া গেল’। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলে, তিনি ভারত থেকে পাসপোর্ট–ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় বিজিবির একটি টহল দল তাঁকে গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করে। পাসপোর্ট আইনে হয় মামলা। ঘটনার সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হলে তিনি সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা বা ছয় মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এ অভিযোগ ছাড়াও তাঁকে যশোরে থানা-পুলিশ আদালতে সোপর্দ করে ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায়। আদালতে পাঠানোর সময় তাঁর দুই হাত পিছমোড়া করে হাতকড়া পরানো ছিল।

তাঁকে পাসপোর্ট আইনে মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে সামনে এল। ওই সাংবাদিক ৫৪ দিন কোথায় ছিলেন, কেন ছিলেন, এটার কোনো তদন্ত হলো না। পাসপোর্ট আইনের মামলায় জামিন পেলেও ৫৪ ধারায় তাঁকে হাজতবাস করতে হবে।

সবই বোঝা গেল। কিন্তু দুই হাত পিছমোড়া করে হাতকড়া পরিয়ে তাঁকে আদালতে নেওয়া হলো কেন, এটা বোধগম্য হলো না। একজন মধ্যবয়সী সাংবাদিক কীভাবে পুলিশের কাছে বিপজ্জনক আসামি বিবেচিত হতে পারেন? সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় তাঁকে হাতকড়া পরানো অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বলে বিবেচনা করা যায়।

অবশ্য অতীতেও আমরা অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এমন নাজেহাল হতে দেখেছি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে।

হাতকড়া পরানোর সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ রয়েছে পুলিশ প্রবিধানে। রয়েছে অতীতের ভূরি ভূরি নজির। কেউ অপরাধ করলে তাকে বিচারের আওতায় আনার মূল দায়িত্ব পুলিশের। সেটা করতে গিয়ে কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার সচেতন বা অবচেতন চেষ্টা পুলিশকে প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এমনিতেই শফিকুল ইসলামের নিখোঁজ থাকার রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব ছিল পুলিশের। তারা ৫৪ দিন সে পথ মাড়ায়নি। পরে তাকে এমন অভিযোগে এমন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করে, যা অনেকেই বিশ্বাস করবে না। আমাদের দেশের চলমান ঘটনাপ্রবাহে মানুষ দ্রুত অতীত ভুলে যায়। তবে সব ভুলেও না। এ অপহরণ–প্রক্রিয়ায় যদি কোনো দুষ্টচক্র জড়িত থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। সেটা হয়নি। তবে শেষ হয়ে যায়নি সময়। তবে হালের অভিযোগগুলো দিয়ে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করার পর মনে হচ্ছে সে বিষয়ে তেমন কিছু হবে না। এখনতাঁকেপাসপোর্ট আইনের মামলা ছাড়াও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আনা মামলার মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি ফিরে এসেছেন, এতে আমরা আনন্দিত। তাঁর সন্তান, সহকর্মী সবাই অন্তত এখনকার মতো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে তাঁকে থানা থেকে আদালতে হাজির করা হয়। যদিও তিনি অনিশ্চিত পথ থেকে বিচারের আওতায় এলেন, তবে এলেন পিছমোড়া হাতকড়া পরা অবস্থায়। সংবাদপত্রের পাতায় এ দৃশ্য অনেকের বিবেককে নাড়া দেবে। একজন সাংবাদিককে এ ধরনের অভিযোগে আদালতে হাজির করতে হাতকড়ার এ অপব্যবহার অসম্মানের যোগ্য। আমরা এ ধরনের গর্হিত কাজকর্মের বিরোধিতা করতেই থাকব। সংবিধানের প্রণেতারা নাগরিকদের যে মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন, তা নিশ্চিত করতেও থাকব সচেষ্ট।