৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  রাত ৪:৩৫  ২রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

চাঁদপুরে কালিবাড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় করোনার হটস্পট

চাঁদপুর জেলায় সংক্রমণের মাসাধিকাল অতিক্রমের পর করোনার হটস্পটে পরিণত হয়েছে চাঁদপুর পৌরসভার কালিবাড়ি ও আশপাশের এলাকা। স্বাস্থ্য বিভাগ পুরো পৌর এলাকাকে হটস্পট হিসেবে বিবেচনা করলেও অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কালিবাড়ি ও তৎসংলগ্ন এলাকাকে।

কিন্তু এখানে লোকসমাগম কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না, নিশ্চিত করা যাচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। তাই এই এলাকায় আক্রান্ত আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি তা বেসামাল পর্যায়ে যেয়েও ঠেকতে পারে।

সিভিল সার্জন অফিসের পরিসংখ্যান মতে, চাঁদপুর জেলায় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পর্যন্ত মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৪জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র চাঁদপুর সদর উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩৭জন। যা মোট আক্রান্তের অর্ধেকের বেশি। আর চাঁদপুর শহরে এ যাবৎ শনাক্তকৃত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩২জন। যা সারা জেলায় মোট আক্রান্তের অর্ধেক।

স্বাস্থ্য বিভাগের এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট চাঁদপুর জেলার প্রধান করোনা হটস্পট এখন চাঁদপুর শহর এলাকা। তবে অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে শহরের কিছু এলাকা সুুনির্দিষ্টভাবে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে।

এসব এলাকা হচ্ছে- চাঁদপুর সদর হাসপাতাল ও সংলগ্ন এলাকা, সাবেক স্ট্র্যান্ড রোড (বর্তমানে কবি নজরুল সড়ক), কালিবাড়ি মোড় থেকে পালবাজার, জোড়পুকুরপাড়, আদালতপাড়া, নতুনবাজার, চিত্রলেখা মোড় থেকে গুয়াখোলা মোড়, বড়স্টেশন এলাকা, মিশন রোড ও বিষ্ণুদী মাদ্রাসা রোড। এই এলাকাগুলোতে এখন পর্যন্ত সিকি শতাধিক করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে চাঁদপুর সদর হাসপাতালের আশপাশে। হাসপাতাল সংলগ্ন চাঁদপুর মডেল থানায় এখন পর্যন্ত ৯জন পুলিশ সদস্য ও পুলিশের পরিবারের আরো ২জন সদস্যের করোনা শনাক্ত হয়েছে। চাঁদপুর সদর হাসপাতালের একজন কুক (রান্নার বাবুর্চি) ও তার স্ত্রী, কম্পিউটার অপারেটর, সাবেক একজন ব্রাদারের স্ত্রীর করোনা শনাক্ত হয়েছে।

হাসপাতালের সামনে অবস্থিত সিভিল সার্জন অফিসের ৩জন কর্মচারীরও করোনা পজেটিভ রিপোর্ট এসেছে। এছাড়া হাসপাতালের সামনে অবস্থিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর আরো ৩জন ল্যাব টেকনিশিয়ান করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ হাসপাতালের আশপাশে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ২১জন।

এরাই শহরের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করেন। তাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এখন চাঁদপুর সদর হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা। এর পাশাপাশি সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এই হাসপাাতাল সংলগ্ন জনবহুল পালবাজার ও কালিবাড়ি পর্যন্ত এলাকাকে।

এই এলাকায় করোনা সংক্রমণ সর্বাধিক হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো চিহ্নিত করেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মকর্তারা মনে করেন তিনটি প্রধান কারণে এই এলাকায় সংক্রমণ সর্বাধিক।

সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- এখানে আক্রান্ত রোগীদের আসা-যাওয়া ও অবস্থান বেশি, এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ ও মার্কেট-দোকানপাট বেশি, পালবাজার ও রাস্তার দু’পাশে প্রচুর হকার এবং বিপুল সংখ্যক ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। তবে এখানকার ক্রেতা-বিক্রেতার অস্বাভাবিক উপস্থিতি, অসচেতনতা ও দূরত্ব বজায় না রাখার দৃশ্য দেখে যে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বলবে করোনার জন্য জেলার সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এটি।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তথা করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখিত এলাকায় হকার উচ্ছেদ, সব ধরণের দোকানপাট বন্ধ রাখা, কাঁচাবাজার অন্যত্র স্থানান্তর করা এমনকি জনচলাচল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের দায়িত্বশীলরা।

চাঁদপুর সরকারি জেনারেল (সদর) হাসপাতালের করোনা বিষয়ক ফোকালপার্সন ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল বলেন, চাঁদপুর সদর হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় লকডাউন সবচেয়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার। বিশেষ করে আক্রান্ত ও তাদের সংস্পর্শে আসা সবার কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা জরুরী।

তিনি বলেন, কালীবাড়িতে আজ দেখলাম যানবাহনের জ্যাম লেগে আছে। করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে হলে এই চিত্রের উল্টো চিত্র নিশ্চিত করতে হবে সবাই মিলে। নইলে এলাকাটি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে যেতে পারে।

চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদা বেগম পলিন বলেন, চাঁদপুর জেলার মধ্যে এখন সর্বাধিক রোগী চাঁদপুর পৌর এলাকায়। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে শহরের প্রাণকেন্দ্র কালিবাড়ি, সদর হাসপাতাল, স্ট্র্যান্ড রোড, কুমিল্লা রোড ও তৎসংলগ্ন এলাকায় আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। তাই এখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও সর্বাধিক। এই এলাকায় যানবাহন ও মানুষের চলাচল সীমিত করে দেওয়া উচিৎ কিছুদিনের জন্য। নইলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

তাছাড়া পুরো শহরে লকডাউন আরো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সহযোগিতা করতে হবে বেশি করে। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি কালিবাড়ি ও আশপাশের এলাকাবাসীকে পরামর্শ দেব পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য আপনারা সবাই স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী থাকুন।

চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত উল্লাহ চাঁদপুর প্রবাহকে বলেন, চাঁদপুর জেলার মধ্যে চাঁদপুর পৌর এলাকা এখন করোনার হটস্পটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শহরের আদি এলাকা কালিবাড়ি ও চারপাশের প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা সর্বাধিক ঝুঁকিতে আছে। কিন্তু মানুষ চরম অসচেতনতার পরিচয় দিয়ে এই এলাকায় প্রতিদিন ভিড় বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে এই এলাকায় জনসমাগম কমাতে হবে, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এক কথায় লকডাউন পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। নইলে পরিস্থিতি আগামীতে আরো অনেক খারাপ হতে পারে।

এদিকে শহরের প্রাণকেন্দ্র কালিবাড়ি এলাকায় ঈদকে সামনে রেখে দিন দিন মানুষের উপস্থিতি বৃদ্ধিতে সচেতন মহল এ নিয়ে বেশ চিন্তিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকেই দাবি তুলছেন চাঁদপুর শহরের কালিবাড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা কিংবা কারফিউ জারি করার। সেটা কোনো কারণে সম্ভব না হলেও অন্তত যানবাহন ও জনচলাচল একেবারে সীমিত করে লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন অনেকে।

এ ব্যাপারে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাজেদুুর রহমান খান বলেন, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সেনাবাহিনী ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। তারপরও কিছু অসচেতন মানুষ শহরে ভিড় করছে। আমার সাথে আজ (বৃহস্পতিবার) পুলিশ সুপারের কথা হয়েছে। আমরা হোম কোয়ারেন্টাইন ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকল্পে আরো কঠোর অভিযান পরিচালনা করবো।

তবে ১৪৪ ধারা জারি কিংবা কারফিউ জারির কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন জেলার এই শীর্ষ কর্মকর্র্তা। তিনি বলেন, আমরা সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নির্দেশনার আলোকে সময়ে সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। সরকার যেভাবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। জেলাবাসীর প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান থাকবে, আপনারা আপনাদের নিজেকে বাঁচাতে এবং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, আশপাশের মানুষ, জেলাবাসী তথা দেশবাসীকে বাঁচাতে ঘরে থাকুন, অতি জরুরী প্রয়োজনে (অনুমোদিত ক্ষেত্রে) বাইরে বেরুলেও মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন।

অনুসন্ধানী প্রতিবেন করেছেন রহিম বাদশা: