১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  দুপুর ১২:৩২  ৮ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

পবিত্র মাহে রমজানে কোরআন তিলাওয়াত

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ


রোজা ও রমজান মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে অনেক সৌভাগ্যবান করেছেন। রমজানের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এ মাসে আল্লাহতায়ালা কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে অন্ধকারাচ্ছন্ন মানবতার অমানিশা কেটে ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে পৃথিবী। কোরআনের সান্নিধ্য পেয়ে রমজান হয়েছে সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে রোজা এমন এক ইবাদত, যার প্রতিকৃতি ও প্রতিদান কেবল আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেবল আল্লাহর ভয় থাকলে সুষ্ঠু ও সুন্দর রোজা পালন করা সম্ভব। এ কারণে আল্লাহ নিজেই এর প্রতিদান প্রদান করবেন। তাই মহান আল্লাহ রোজার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্য মহিমান্বিত মাস রমজানকে নির্ধারণ করেছেন।

রোজার সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক

রোজার সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক অনেক গভীর। রাসুল (সা.) রমজান মাসে অত্যধিক কোরআনের তিলাওয়াত করতেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসুল (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজান এলে জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে দেখা করতেন। তখন তিনি আরও বেশি দান করতেন।রমজানের প্রত্যেক রাতে তার সঙ্গে জিবরাইল (আ.) দেখা করতেন। তখন তিনি তাকে কোরআন শোনাতেন। তাই জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে দেখা হলে রাসুল (সা.) প্রবহমান বাতাসের চেয়ে বেশি দান করতেন। ’ (বোখারি, হাদিস : ১৮০৩, মুসলিম, হাদিস : ২৩০৮)।

ফাতেমা (রা.) থেকে আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) আমাকে গোপনে বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতি বছর কোরআন শুনিয়েছেন। আর তিনি আমাকে এ বছর দুবার শুনিয়েছেন। এতে আমার মনে হচ্ছে যে আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ’ (বোখারি, হাদিস নম্বর : ৪৭৩১)।

প্রখ্যাত আলেম শায়খ আহমদ বিন আবদুল আহাদ সারহিন্দি (রহ.) বলেন, ‘কোরআনের সঙ্গে এ মাসের সম্পর্ক অনেক গভীর। এ মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। সব ধরনের কল্যাণ ও অনুগ্রহের ফল্গুধারা এ মাসে বর্ষিত হয়। অতঃপর এই সমুদ্রের সামান্য ফোঁটা বছরব্যাপী মানুষের কাছে পৌঁছাতে থাকে। পুরো বছরকে সমৃদ্ধ করতে থাকে এই মাস। এ সময়ের বিশৃঙ্খলার দরুন বাকি সময় তথা পুরো বছর বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। যে এই বরকতপূর্ণ মাস সন্তুষ্টচিত্তে অতিবাহিত করল, তার জন্য সুসংবাদ। আর যে তা ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি চিত্তে অতিবাহিত করল, তার জন্য ধ্বংস। সে কল্যাণ ও বরকতের বারিধারা থেকে বঞ্চিত হলো। ’ (আল মাকতুবাত আর রাব্বানিয়্যাহ, ১/৮)।

রাতের বেলা তিলাওয়াত সুন্নত

মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ও কোরআন তিলাওয়াত করা। তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ সময় কোরআনের তিলাওয়াত প্রিয় নবীর অন্যতম অভ্যাস ছিল। তাওবা, ইস্তেগফার ও দোয়ার উপযুক্ত সময় শেষরাত্রি। তাই আল্লাহতায়ালা মুমিনের পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘আর তারা রাতের কম সময়ই ঘুমিয়ে থাকে এবং সাহরি তথা শেষরাত্রিতে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। ’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত : ১৭-১৮)।

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি তা কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। ’ (সুরা কদর, আয়াত : ১)। প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘মূলত কোরআন লাইলাতুল কদরে এক সঙ্গে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তা ২৩ বছরব্যাপী রাসুল (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। ’

ইবনে আব্বাস (রা.) আরও বলেছেন, রাসুল (সা.) ও জিবরাইল (আ.)-এর মধ্যে রাতের বেলা পারস্পরিক কোরআন শোনানোর দ্বারা বোঝা যায়, রমজানে রাতের বেলা বেশি বেশি তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। কেননা রাতের বেলা ব্যস্ততা শেষ হয়ে যায়। এ সময় মানুষের মনোবল দৃঢ় থাকে। অন্তর ও ভাষায় চিন্তা-গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়। কেননা আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রাতের বেলা ইবাদতের জন্য ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক ও সুস্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। ’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৬) [লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা : ৩১৫]।

হাদিসে রাতের বেলা কোরআন তিলাওয়াতের অনেক গুরুত্ব এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা ১০ আয়াত তিলাওয়াত করবে, সে গাফেল তথা অলসদের মধ্যে গণ্য হবে না। ’ (মুসতাদরাকে হাকেম : ১/৭৪২)।

রমজানের রাতে অন্যান্য সময়ের চেয়ে রাসুল (সা.) দীর্ঘ সময় কিরাত পড়তেন। রমজানের এক রাতে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে হুজায়ফা (রা.) নামাজ আদায় করেন। হুজায়ফ (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) সুরা বাকারা পাঠ করেন। অতঃপর সুরা আল ইমরান পাঠ করেন। ভয়ের আয়াত পাঠের সময় বিরতি নিতেন এবং আল্লাহর কাছে পরিত্রাণ চাইতেন। দুই রাকাত সমাপ্ত হলে বেলাল (রা.) এসে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ’ (মুসনাদে আহমাদ, ৪০০/৫)।

আয়েশা (রা.) দিনের শুরুর ভাগে মাসহাফ থেকে তিলাওয়াত করতেন। অতঃপর সূর্য উদিত হলে ঘুমিয়ে পড়তেন। সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, রমজান মাস এলে জুবাইদ ইয়ামি (রহ.) সঙ্গীদের জমায়েত করে মাসহাফ এনে দিতেন। একজন মুমিনের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে তিন আয়াতের চেয়ে বেশি তিলওয়াত করা উচিত। এর চেয়ে কম তিলাওয়াত করা অনুচিত। এ কথার ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, মর্যাদাপূর্ণ সময় (যেমন রমজান মাস বিশেষত লাইলাতুল কদরের রাত) ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানের (যেমন মক্কার বাইরের কেউ মক্কায় এলে) ক্ষেত্রে কোরআনের তিলাওয়াত অত্যধিক করা মুস্তাহাব। অনেক ইমাম এমন মতামত ব্যক্ত করেছেন।

কোরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য কাজ

রমজান মাসে মুমিনের দুই ধরনের আত্মত্যাগ করতে হয়। দিনের বেলা রোজা রাখতে হয় এবং রাতের বেলা নামাজে দাঁড়ানোর মাধ্যমে আত্মত্যাগ করতে হয়। এই দুই গুণ ধারণ করে অবিচল থাকলে আখিরাতে তার জন্য অগণিত প্রতিদান থাকবে। আবদুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, রোজা ও তাহাজ্জুদের নামাজ কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আমার রব, আমি দিনের বেলা তাকে পানাহার থেকে বিরত রেখেছি। অতএব আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আর কোরআন বলবে, আমি রাতের বেলা তাকে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। অতঃপর উভয়ে সুপারিশ করতে থাকবে। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৬৫৮৯)।

ইমাম জুহরি (রহ.) রমজান এলে বলতেন, ‘এ মাস কোরআন তিলাওয়াত ও খাবার প্রদানের মাস। ইবনে আবদুল হিকাম বর্ণনা করেছেন, রমজান মাস শুরু হলে ইমাম মালেক (রহ.) হাদিসের অধ্যাপনা ও আলেমদের সঙ্গে বসা থেকে বিরত থাকতেন। এ সময় তিনি পবিত্র কোরআন তিলওয়াতে পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করতেন। আবদুর রাজ্জাক বর্ণনা করেছেন, প্রখ্যাত তাবেয়ি ও ফকিহ সুফিয়ান সাওরি (রহ.) রমজান শুরু হলে সব ধরনের ইবাদত ছেড়ে কেবল কোরআন তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকতেন।