৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  রাত ৪:৩০  ২রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

বিদেশে চিকিৎসা নেয়া রোগীরা এখন দোটানার ঝুঁকিতে

বার্তা কক্ষ:

বেশ কিছু দিন আগে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে জটিল রোগের অপারেশন করিয়েছেন নাটোরের বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া। অপারেশনের সময় তার শরীরে একটি প্লেট লাগিয়ে দেয়া হয়। এটি বের করার সময় নির্ধারণ ছিল গত মার্চ মাসে। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে তিনি আর ভারত যেতে পারেননি। ফলে শরীর থেকে সেই প্লেটটি বের করতে পারছেন না তিনি। বাধ্য হয়ে রাজশাহীর একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ওই চিকিৎসক তাকে চিকিৎসার আগেই করোনা টেস্ট করিয়ে নেন। পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ এলেও নানা কারণে এখনো শরীরে সেই বিশেষ বস্তু বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে।

একইভাবে লকডাউনে সমস্যায় পড়েছেন ভারতে চিকিৎসাপ্রত্যাশী বাগাতিপাড়ার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আব্দুল আউয়াল। তিনি গত ২৯ ফেব্রুয়ারি উপমহাদেশের প্রখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডা: দেবী শেঠী পরিচালিত ব্যাঙ্গালুরুর নারায়না হৃদালয়া হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করান। তিন মাস পর ৩ জুন চেকআপের জন্য আবারো যাওয়ার কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে যেতে পারছেন না। এ দিকে সেখান থেকে আনা ওষুধপত্রাদিও শেষ হয়ে গেছে। শারীরিক বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না তিনি। ইমেইলে যোগাযোগ করা হলে তারা দেশে টেস্ট করে দেশীয় চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দিচ্ছেন। এসব চিন্তায় মানসিকভাবে অস্বস্তিতে পড়েছেন এই রোগী।

ভালো চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিত্তবানদের অনেকেই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। দেশে চিকিৎসা নেয়া যায় এমন অসুখেও বিদেশ চলে যান তারা। সব মিলে বিদেশে চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা কয়েক লাখ।

থাইল্যান্ডের শুধু ব্যাংকক হাসপাতালেই প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা করাতে যান বাংলাদেশ থেকে। হাসপাতালটির ঢাকা অফিস দিনে ১০ থেকে ১৩ জনকে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এ ছাড়া বামরুনগ্রাদসহ দেশটির অন্য হাসপাতালগুলোও বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী পাচ্ছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার হাসপাতালেও বাংলাদেশী রোগীদের ভিড়। এভাবে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ চিকিৎসার জন্য বাইরে চলে যাচ্ছে।

চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা বলছেন, ভালো চিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ওপর রোগীদের আস্থার ঘাটতি ও একেক হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই পরীক্ষার একাধিক ফলাফলের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের ভেলর সিএমসি হাসপাতালে গত ৯ বছর ধরে চিকিৎসা করাচ্ছেন শিরিন আক্তার। গত বছরের ডিসেম্বরে সর্বশেষ তিনি ডাক্তার দেখিয়ে আসেন। এরপর গত ১১ এপ্রিল তার ফলোআপের সময় নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু লকডাউনের কারণে তিনি যেতে পারেননি। যেটুকু ওষুধ এনেছিলেন, তাও শেষ হয়ে গেছে। এর মধ্যে তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে। এরপর কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং কবে যেতে পারবেন, তাও জানেন না তিনি।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মো: বিল্লাল আলম বলেন, এ লকডাউনের সময়েও কারো উচিত হবে না গুরুতর কোনো সমস্যা নিয়ে অপেক্ষা করা। বরং তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করা।

তবে চিকিৎসাপ্রার্থীদের অভিযোগ, যারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন তাদের বেশির ভাগেরই আচরণ ভালো নয়। সেবার ক্ষেত্রে তাদের বাণিজ্যিক মানসিকতা কাজ করে। বিদেশে চিকিৎসকরা মনোযোগ দিয়ে যথেষ্ট সময় নিয়ে রোগীর কথা শোনেন। অনেকটা গল্প করেই রোগীর মনোবল দৃঢ় করেন তারা। আর আমাদের দেশে এ চিত্র একদম ভিন্ন। রোগীর কথা শোনার সময়ই থাকে না অনেক চিকিৎসকের। রোগী তার সমস্যাগুলো বলার আগেই লেখা হয়ে যায় প্রেসক্রিপশন।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, চিকিৎসার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিমালা এবং কৌশল নির্ধারণ করা নেই। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বিদেশগামীদের বিষয়ে কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে বিদেশ চলে যাচ্ছেন, যা প্রমাণ করে আমাদের দেশে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা নেই। অনেক চিকিৎসক সরাসরি রোগীদের সাথে কথা বলেন না। রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন না। এতে চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের ঘাটতি দেখা দেয়। চিকিৎসকরা রোগীর কনফিডেন্স আনতে পারছেন না। রোগনির্ণয়ে নির্ভুল পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে ডায়াগনস্টিক টেস্টের মান ভালো না হওয়ায় অনেক সময় চিকিৎসক রোগনির্ণয়ে ব্যর্থ হন।নয়াদিগন্ত অনলাইন ।