১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  রাত ৩:৪০  ৭ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

সংসার চালাতে নানা পেশায় জড়িত হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকরা

নিউজ বার্তাকক্ষ:

পেটের ভাত জোগাড়ের চেষ্টায় দেশের কয়েক হাজার শিক্ষক এখন নিজ পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে আপ্রাণ লড়াই করে যাচ্ছেন। কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ মৌসুমি ফলও বিক্রি করছেন। কেউ-বা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালাচ্ছেন।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ‘মিরপুর মাহমুদা চৌধুরী কলেজ’-এর সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক আরিফুর রহমান। নন-এমপিও শিক্ষক তিনি। করোনার কারণে গত মার্চে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার বেতন-ভাতাও বন্ধ। বাবা-মা ও দুই সন্তানসহ পরিবারের সদস্য ছয়জন। তাদের মুখে আহার তুলে দিতে এপ্রিল মাস থেকে স্থানীয় কাতলাগাড়ি বাজারে গরু-ছাগলের ওষুধ বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। এভাবে পাওয়া যৎসামান্য আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

এ শিক্ষক বলেন,’লকডাউনের কারণে বাজারেও তেমন লোকজন আসে না। আবার এলেও সবার তো এ ধরনের ওষুধ লাগে না। কোনো রকমে পেটেভাতে বেঁচে আছি। কলেজে আমি অনার্স পড়াই। পেটের দায়েই গরু-ছাগলের ওষুধ বেচতে হচ্ছে এখন!’ একই জেলার ‘কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ’-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক ইমরুল হোসেন।

তিনিও অনার্সের শিক্ষক। নিজেও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। কলেজ থেকে টানা তিন মাস বেতন না পেয়ে পেটের দায়ে এ শিক্ষক কষ্টসাধ্য কৃষিকাজে নেমে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার মুঠোফোনে ফোন দিতেই তার স্ত্রী সেটি নিয়ে যান মাঠে,সেখানে তিনি কলাগাছের বাগানে আগাছা নিড়াচ্ছিলেন।

ইমরুল হোসেন বলেন, ‘নিজের দুর্দশার কথা বলতে খুব লজ্জা লাগে! বেশি কিছু বলতে চাই না,বুঝতেও চাই না। শুধু বুঝি-পরিবারের পাঁচ সদস্যের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতে হবে।’

আরিফ ও ইমরুলের মতো দেশের কয়েক হাজার শিক্ষক এখন নিজ পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। পেটের ভাত জোগাড়ের চেষ্টায় দারিদ্র্যের সঙ্গে আপ্রাণ লড়াই করে যাচ্ছেন। কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ মৌসুমি ফলও বিক্রি করছেন। কেউ-বা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালাচ্ছেন। করোনাকাল তাদের জীবনে এসেছে ঘোর অমানিশা হয়ে।

বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক তারা। কয়েক মাস বেতন বন্ধ। পেট তো লকডাউন মানে না। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে নেমেছেন কষ্টকর এসব কাজে। অন্তত ১৪ লাখ বেসরকারি শিক্ষক পরিবার এমন দুর্দিনের মুখোমুখি।

এমনই এক শিক্ষক দিনাজপুরের পার্বতীপুরের গোলাম কিবরিয়া। এখন তার হাতে চক-ডাস্টারের বদলে তুলে নিয়েছেন কোদাল ও ঝুড়ি। শ্রমসাধ্য রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন পার্বতীপুরের ব্রাইনটেন রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের এই শিক্ষক। নিজে অবিবাহিত হলেও বাবা-মা, ভাইবোন, দাদিসহ পরিবারে মোট ৯ জন সদস্য এ শিক্ষকের।

নিজের দুর্দশার কথা জানিয়ে কিবরিয়া বলেন, স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে গত মার্চে। বন্ধের আগে এক মাসের বেতন পেয়েছিলেন, এরপর এ পর্যন্ত আর কোনো বেতন পাননি। যে কাজই হোক না কেন, না করে আর উপায় ছিল না!

বেতন বন্ধ মেহেরপুরের কিডস ওয়ার্ল্ডস স্কলারস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক সুজন ইসলামেরও। পেটের দায়ে চালাতে শুরু করেছেন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। এই শিক্ষক বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় আমি নিরূপায়। এলাকার অনেকে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু সংসার তো চালাতে হবে।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গ্রিন লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক কাওসার হোসেন এখন মৌসুমি ফল আম বিক্রেতা। নিজের স্কুলের সামনেই আম বিক্রি করেন তিনি। বললেন, ‘করোনার জন্য তিন মাস ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় খুবই নাজেহাল অবস্থায় আছি। বাধ্য হয়ে স্কুলের সামনে আম বেচছি।’

রাজধানীর কাজীপাড়ার লিটল ফ্লাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ তানজীম বলেন, ‘কেমন বেকায়দায় পড়েছি, বুঝতেই পারছেন! শ্রম বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় তো দেখি না। করোনার কারণে তো শিক্ষকদের টিউশনিও নেই।’

কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও কলেজ ঐক্যপরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সরকার থেকে আর্থিক সহায়তা পেলে বেসরকারি স্কুলগুলো বন্ধের হাত থেকে রক্ষা পাবে। শিক্ষকদের মর্যাদাও রক্ষা পাবে।’

ফ্রেন্ডশিপ কিন্ডারগার্টেন সোসাইটির চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ বলেন, ‘সরকার এ সেক্টরের উন্নয়ন না ঘটালে আগামী বছরেই শিক্ষা খাতে বিরাট ধস নামবে।’

সংকটের কারণ

করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ও যথাসময়ে টিউশন ফি আদায় না হওয়ায় বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অন্তত ১৪ লাখ বেসরকারি শিক্ষক পরিবারে এখন দিশেহারা অবস্থা। বেতনের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ তাদের প্রাইভেট-টিউশনিও। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নন-এমপিও শিক্ষকরা।

কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের বেতন বন্ধ টানা চার মাস। ফেব্রুয়ারির পর তারা আর বেতন পাননি। বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও পড়েছেন সংকটে। আয় কমে যাওয়ায় টিউশন ফি পরিশোধে আগ্রহী নন অভিভাবকরাও।

দেশে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নন-এমপিও স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় ১ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এ বছর ২ হাজার ৬১৫ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় এদের মধ্যে ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর সরকারি বেতনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী।

‘বাংলাদেশ নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের’ সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, ‘নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে এমনিতেই শিক্ষকরা তেমন বেতন পান না। বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রাইভেট-টিউশনি করেন। কিন্তু এখন সবই বন্ধ। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষকের দুর্দশার খবর পাই, অনেকে কান্নাকাটি করেন। কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। পাঁচ হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮০ হাজার শিক্ষক পরিবারে এখন কান্নার রোল পড়েছে।’

দেশে প্রায় ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেনে সাত লাখ শিক্ষক রয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান চলে ভাড়াবাড়িতে। ব্যক্তিমালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগই নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপরে। টিউশন ফির টাকায়ই বাড়ি ভাড়া, নানা ধরনের বিল ও শিক্ষকদের বেতন দেয়া হয়।

কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারা ভূঞা বলেন, ‘অভিভাবকরা টিউশন ফি দিচ্ছেন না, তাই আমরাও শিক্ষকদের বেতন ও বাড়ি ভাড়া দিতে পারছি না। সরকার সহায়তা না করায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে বিকল্প আর কোনো উপায় ছিল না।’

সারাদেশের ৩৫২টি অনার্স-মাস্টার্স কলেজের নন-এমপিও ১০ হাজার শিক্ষকও পড়েছেন দুর্দশায়। এ শিক্ষকদের সংগঠনের সভাপতি নেকবর হোসেন বলেন, ‘বেতন-ভাড়া ছাড়া পরিবার-পরিজন নিয়ে কত মাস আর চলা যায় বলুন? সঙ্গত কারণেই শিক্ষকরা জীবিকার তাগিদে অনভ্যস্ত কায়িক পরিশ্রমযুক্ত কাজে ঝুঁকে পড়ছেন।’

বিপন্ন জীবনযাপন করছেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরাও। দেশে এমন চার হাজার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১ হাজার শিক্ষক আছেন। এর মধ্যে মাত্র এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকদের ২৫০০ টাকা ও সহকারী শিক্ষকদের ২৩০০ টাকা ভাতা দেয় সরকার।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের সভাপতি এস এম জয়নাল আবেদিন জিহাদী বলেন,’করোনার মধ্যে আমাদের শিক্ষকরা চরম কষ্টে জীবন যাপন করছেন। আর কতদিন বেতন ছাড়া চাকরি করব আমরা? আমার শিক্ষকরা না খেয়ে আছেন, ভাই!’

শিক্ষকদের দুরবস্থা নিয়ে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু বলেন,‘ মহামারি কভিড-১৯ এর ভয়াবহ থাবায় দীর্ঘ তিন মাস ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী, ১৪ লাখ শিক্ষক এবং ৮ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৯৭ % শিক্ষা বেসরকারি খাতে পরিচালিত হয়। নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফির আয় থেকে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের পর শিক্ষক কর্মচারীদের যৎসামান্য বেতন দেওয়া হয়। এর বাইরে এসব শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু আয় করেন এবং সব মিলিয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন। করোনার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বন্ধ। প্রাইভেট পড়ানোও বন্ধ। এতে তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’

তিনি বলেন,‘ শিক্ষকদের পেটে খিদে রেখে শ্রেণিকক্ষে ভালো পাঠদান সম্ভব নয়। তাদের সংসারের নূ্যনতম চাহিদা সরকারকে পূরণ করতে হবে। নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের (অনার্স মাস্টার্স, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি, এসিটি) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এমপিও নিশ্চিত করতে হবে।’

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের এসব শিক্ষককে দেখভালকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড.সৈয়দ মো.গোলাম ফারুক বলেন, শিক্ষকদের সমস্যা-সংকটের বিষয়ে সরকার অবহিত। তাদের দুর্ভোগ লাঘবে অনুদান, এমপিওভুক্তিসহ নানা উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

সরকারি অনুদান

বিভিন্ন স্তরের বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য করোনাকালে বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। গত বুধবার এ অর্থ ছাড় করা হয়েছে। করোনাকালে লক্ষাধিক নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে বিতরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। বিষয়টি জানিয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী বৃহস্পতিবার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ! এমপিওবিহীন শিক্ষকদের জন্য এ দুর্যোগের সময় যখন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, তখন ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা আমাদের ৮০ হাজার ৭৪৭ শিক্ষক ও ২৫ হাজার ৩৮ কর্মচারীর মধ্যে বিতরণের জন্য জরুরি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, শিক্ষকদের এককালীন ৫ হাজার ও কর্মচারীদের দুই হাজার পাঁচশ’ করে টাকা দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের মাধ্যমে আগামি দু-এক দিনের মধ্যে এ টাকা বিতরণ শুরু হবে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। এর পরই এ বরাদ্দ দেয়া হয়।