৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  দুপুর ২:৪৪  ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
২২শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

মেসি-নেইমারকে নিয়ে মাতামাতি

নিজস্ব প্রতিনিধি:

লিওনেল মেসি কোন দলে যাবেন? এটাই সম্ভবত এখন সবচেয়ে উচ্চারিত প্রশ্ন। সবাই অধীর আগ্রহ নিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর তালাশ করছেন। মেসি এখন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। দু-এক দিন আগেও সবার ব্যস্ততা ছিল ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে। পিএসজি প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হবে, না জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ ষষ্ঠবারের মতো শিরোপা জিতে নেবে—এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তর্কে মেতে ছিলেন অনেকে। যদিও শুরুর দিকে বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদ শিবিরে বিভক্ত ছিল ফুটবলপ্রেমিকেরা। রাত জেগে অনেকেই মেসি–রোনালদোর খেলা দেখছেন। খেলা নিয়ে তুমুল আলোচনা–সমালোচনা, তর্ক–বিতর্ক করেছেন।

রিয়াল, বার্সেলোনা বা মেসি আমাদের দেশীয় কেউ না। তারপরও তাঁদের নিয়ে ক্রীড়ামোদীদের আগ্রহের ঘাটতি নেই। অথচ একসময় আমাদের আবাহনী, মোহামেডান, আসলাম, সাব্বিরদের নিয়ে কী তুমুল আলোচনা, দলাদলিই না হতো।

মারামারিও নেহাত কম হয়নি। কিন্তু ওই সব দিন হারিয়ে গেল কেন? ঘরোয়া খেলাধুলা এখন আর আলোচনাতেই নেই।

খেলাধুলার প্রতি সাধারণ মানুষের যে অনুরাগ–আবেগ, সেটাই প্রকাশিত হতো আবাহনী বা মোহামেডানকে সমর্থন করার মধ্য দিয়ে। এখন আর আবাহনী–মোহামেডানের খেলা দেখতে সমর্থকেরা স্টেডিয়ামে যান না। গত কয়েক বছরে আবাহনী-মোহামেডানের দ্বৈরথ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ আলোচনা করেছেন বলেও নজরে আসেনি। অথচ আশি বা নব্বইয়ের দশকে আমাদের আন্তর্জাতিক মানের কোনো তারকা খেলোয়াড় ছিল না। এখন আছে। সাকিব আল হাসান বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুলের মতো ব্যাটসম্যান। আছেন মাশরাফির মতো এক লড়াকু। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনাল পর্যন্ত লড়েছে। কিন্তু এখন যেন আগের সেই তাল নেই। যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের খেলা নিয়ে উন্মাদনা আছে; কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেট বা অন্য খেলাধুলা নিয়ে কোনো আলাপচারিতা নেই। জনপরিসর থেকে একেবারেই উধাও।

এর কারণ কী? অনেকেই মনে করেন, ঘরোয়া খেলাধুলার আসরে এখন আর কোনো প্রতিযোগিতা নেই। পাতানো খেলা নিয়ে ধুঁকছে ক্রিকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটে ৯০ বলের ওভার করার নজিরও আছে। ফুটবলেও একই অবস্থা। পাতানো খেলার অভিযোগ করে অভিযোগকারীই সাজা পেয়েছেন। সব সম্ভবের দেশে এসবই সম্ভব ক্রীড়াঙ্গনে।

কেলেঙ্কারির কথা জেনেশুনে খেলা দেখা বা খেলা নিয়ে আলোচনার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছে সমর্থকেরা। মাঠে প্রতিযোগিতা না থাকলে দর্শক যাবে কেন?

অথচ এখন মাঠে প্রতিযোগিতা বেশি করে থাকার কথা। ক্লাবগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকও আগের তুলনায় অনেক বেশি। আগে কালেভদ্রে ব্রাদার্স, বিমান ও মেরিনার্স বা ঊষা বড় দল আবাহনী, মোহামেডানের সঙ্গে বিভিন্ন খেলায় শিরোপার ভাগ বসাত। এখন কিন্তু সমপর্যায়ের দল অনেক। জাতীয় ফুটবল লিগেই সমমানের দল আছে ছয় থেকে সাতটি। ক্রিকেটেও একই অবস্থা। আবাহনী–মোহামেডানের বাইরের দল শিরোপাও জিতে হরদম। হিসাব বলে, এখন ফুটবল বা ক্রিকেট লিগ আগের থেকে জমজমাট হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকার লিগে গ্যালারিগুলো খাঁ খাঁ করে। শেষবারের বিপিএলেও দর্শক জোটেনি খুব বেশি।

সমর্থক–দর্শকেরা মাঠ থেকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে মেসি–রোনালদোরা দেশীয় দর্শকদের যতটা আকৃষ্ট করেন; দেশীয় খেলোয়াড়েরা ততটা পারছেন না। রাত জেগে যত মানুষ মেসির খেলা দেখে, তত মানুষ ঢাকার লিগে আবাহনী মোহামেডানের খেলা দেখতে যায় না। ক্রিকেটে সাকিব, মাশরাফির জনপ্রিয়তায় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু যতক্ষণ জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেন, ততক্ষণই তাঁরা নায়ক। জাতীয় দলের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ কাজ করে। কিন্তু ক্লাব পর্যায়ে তাঁরা আকরাম, নান্নুদের মতো দর্শক টানতে পারছেন না।

বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের এখন কোনো নায়ক নেই। আইকন বলতে যা বোঝায়, তেমন কেউ নেই। তাই এখন মুন্না না কায়সার, আসলাম না সালাম মোর্শেদি, রাজ্জাক না আলমগীর, ববিতা না শাবানা, সাবিনা ইয়াসমীন না রুনা লায়লা, কে কার থেকে ভালো—এসব নিয়ে সমাজে আলোচনা, সমালোচনা কোনোটাই নেই। অনেকে এই ধরনের আলোচনাকে কুতর্ক বলতে পারেন। কিন্তু এই ধরনের আলোচনায় বুদ্ধিবৃত্তিক একধরনের জ্ঞানের আদান–প্রদান হয়। কোনো ভক্ত যখন মেসির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন, তার মানে ওই ভক্ত নিয়মিত মেসির খেলা দেখেন এবং খেলাটা বোঝেন এবং সেই মোতাবেক তিনি কথা বলেন। যিনি খেলা দেখেন না, গান শোনেন না, সিনেমা দেখেন না, তাঁর পক্ষে এ ধরনের আলোচনায় শরিক হওয়ার সম্ভব না। আর না দেখা ও শোনার কারণ হচ্ছে, কোনো আইকনিক চরিত্র তাঁকে আকৃষ্ট করছে না।

খেলাধুলা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আইকন না থাকা এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজের আভাস দেয়। সমাজ রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় কেউই অন্যদের থেকে পৃথক হতে পারছেন না। তাই সমাজে ভিনদেশি আইকনরা অবস্থান করে নিচ্ছে। এখন বিশ্বায়নের যুগ।

টিভি খুললেই মেসি, রোনালদো, নেইমারদের খেলা দেখা যায়। তাই তাঁদের প্রতি ভক্তদের অনুরাগ বেশি। উঁচু দরের খেলা দেখে ঢাকা লিগের খেলা কারও ভালো লাগে না। এ রকম যুক্তির পক্ষে অনেকেই কথা বলে থাকেন। তাহলে শুধু ঢাকা লিগ কেন, সারা বিশ্বেই স্থানীয় লিগের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমে যেত। বেশি দূরে যেতে হবে না।

কলকাতাতেই এখনো মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে সল্ট লেকে দর্শনের ঢল নামে। উচ্ছ্বাসের আবিরে ঢেকে যায় যুবভারতীর গ্যালারি। আর আমাদের মাঠে দর্শক নেই।

কিন্তু মনে হয়, আমাদের দর্শকদের খেলার প্রতি টান কমেনি। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ আগের মতোই আছে। এ কারণেই তারা রাত জেগে খেলা দেখে। ঢাকায় ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ম্যাচ থাকলে দর্শক ঠিকই মাঠে যায়। তবে দেশীয় খেলাধুলার আয়োজনের প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করে না। কারণ, খেলাধুলার মধ্যেও দুর্নীতি প্রবেশ করেছে মারাত্মকভাবে। নেতিবাচক রাজনীতির দখলে দেশের ক্রীড়াঙ্গন।

খেলোয়াড় থেকে সংগঠক—সবাই এখন অপরাজনীতিতে যুক্ত। আগে রাজনীতিবিদেরা সংগঠক হতেন। তাঁরাই ক্লাবগুলো পরিচালনা করতেন। এখন সংগঠক ও খেলোয়াড়েরা রাজনীতিবিদ হন। রাজনীতি খারাপ কিছু না। যেকেউই রাজনীতি করতে পারেন। তবে নীতি–নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে না। খেলোয়াড়েরা বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ ভোটের মাধ্যমে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হন। পাতানো খেলার জন্য সংগঠকেরা নিজেরাই দর্শকদের মাঠে দেখতে চান না। সমাজের আর দশটা সেক্টরের মতো ক্রীড়াঙ্গনেও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। ১৫ থেকে ২০ বছর ধরেই এই অবক্ষয়ের শুরু।

পতিত মূল্যবোধ ধারণ করে কেউ নায়ক হতে পারেন না। প্রয়াত ফুটবলার মোনেম মুন্নার নিশ্চয়ই কোনো রাজনৈতিক সমর্থন ছিল। কিন্তু তাঁর মূল্যবোধ নিয়ে কোনো দ্বিমত ছিল না। এ কারণেই মৃত্যুর এত বছর পরেও নায়কের আসনে এখনো সমাসীন মুন্না। তিনি শুধু আবাহনীরই নায়ক না; তিনি বাংলাদেশের মুন্না। সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও তিনি সমানভাবে জনপ্রিয়। মুন্নার সমান জনপ্রিয় না হোক, তাঁর ধারেকাছেও কেউ গত ১৫ থেকে ২০ বছরে আসতে পারেননি। না ফুটবলে, না ক্রিকেটে্।