৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  দুপুর ২:২২  ৫ই শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরী
১৮ই মে, ২০২১ ইং

ফরিদগঞ্জে খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম, দোকান উচ্ছেদের নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি:

ফরিদগঞ্জ উপজেলায় খরা মৌসুমে খালে পানি সংরক্ষণ এবং কৃষি জমিতে পানি সেচের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)র আওতায় খাল খননের কার্যক্রম চলছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। ৪ থেকে ৫ ফুট পানির মধ্যেই ইস্কবেটর মেশিন দিয়ে খনন করা হচ্ছে খাল। ফলে কী পরিমাণ খননকাজ হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এদিকে, খননকৃত মাটি খালের পাড়ে রাখার ফলে কৃষকদের চলাচলের অসুবিধা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও কৃষকরা।

অন্যদিকে রুমুর খালের গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের আষ্টা বাজার অংশে খালের (উত্তর পাড়) জেলা পরিষদের জায়গা, আষ্টা বাজারের সাধারন ব্যবসায়ীরা তা জেলা পরিষদ থেকে লিজ নিয়ে দোকান ঘর নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। খনন কাজের ঠিকাদার, বাজার কমিটির সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও একটি দালাল চক্র মিলে মাইকিং করে দোকান উচ্ছেদের ঘোষণা দেয়, সাধারণ ব্যবসায়ীরা উপায় না পেয়ে ঐ চক্রের জালে পা দিয়ে দেয়, এতে করে প্রায় ১’শ দোকানীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন ঠিকাদারসহ বাজার ব্যবসায়ী কমিটির কর্তা ব্যক্তি ও দালাল চক্র। শুধু তাই নয় খাল পাড়ে বসত ঘর নির্মাণ করে বসবাস করা পরিবার গুলোকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকেও বিভিন্ন অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আষ্টা বাজার সংলগ্ন ছানা উল্লা নামে এক জমির মালিকের জমির মাটি কেটে উক্ত জমি খালে পরিনত করায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করে, যার অনুলিপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে প্রদান করেন।

এদিকে খাল থেকে উত্তোলন কৃত মাটি স্থানীয় আষ্টা বাজারের স্বর্ন ব্যবসায়ী দিনেসের পুকুর ভরাটের জন্য বিক্রিয় হয় বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে খনন কাজে ঠিকাদারের এমন অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দায়ী করছেন সচেতন মহল।

চাঁদপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অফিস সূত্রে জানাযায়, উপজেলার ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারী কলেজ থেকে থেকে বৈচাতরী বড়পিড খালের মুখ পর্যন্ত সাড়ে ৯ কিলোমিটার ৭শ’ ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের খাল খননের কাজ চলছে। কাজের বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৩ টাকা। টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পেয়েছে সাম ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। খনন করা হবে খালের তলা ৪.৩৮ মিটার, স্থানভেদে সাবেক গভীরতা প্রায় ১ মিটার বা তার বেশি এবং ১.৫ ও ১.৫ ওপরের দিকে গড় ১৮-২০ মিটার।

চাঁদপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোডের্র (এসও) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সঠিক নিয়মে কাজ না হওয়ায় খনন কাজ বন্ধ করা হয়েছে। সরকারী গাছ কেটে বিক্রয় এবং দোকান উচ্ছেদের নামে আষ্টা বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় ও খাল পাড়ে বসত করা অসহায় মানুষ গুলোর কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমান পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এ উপজেলার রুমুর খাল সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার কৃষকদের একটিমাত্র ফসল ইরি-বোরো। খরা মৌসুমে খালে পানি কম থাকায় ফলে জমিতে ঠিকমতো পানি দেয়া সম্ভব হয় না। তাই খরা মৌসুমে খালে পানি সংরক্ষণে রাখতে খাল খনন করা হচ্ছে। পানি শুকিয়ে খাল খনন করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। আবার খননকৃত মাটি খালের পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে খালের পাড়ে রাখা মাটি আবারও খালে পড়ে ভরাট হয়ে যাবে। তবে কাজের শুরু থেকেই খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় এলাকাবাসীরা। তারা বলছেন, খাল খননে যে পরিমাণ বরাদ্দ করা হয়েছে তার অর্ধেকের অর্ধেক টাকাও খরচ হবে না।

আষ্টা গ্রামের কৃষক মফিজুর রহমান বলেন, খাল যে পরিমাণ গভীর করার কথা তা করা হচ্ছে না। খালে পানি রেখেই মাটি কাটা হচ্ছে। পানির মধ্যে থেকে কী পরিমাণ মাটি কাটা হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে না। ধারণার ওপর পানির মধ্যে মাটি কাটা হচ্ছে। আর খালের তলা তো সমান হওয়ার প্রশ্নই আসে না। খরা মৌসুমে পানি থাকার কথা থাকলেও তা হবে না। এতে সরকারের যে উদ্দেশ্য তা ভেস্তে যাবে।

পাইকপাড়া গ্রামের কৃষক মনির হোসেন, শফিকসহ কয়েকজন বলেন, পাড় কেটে খালে নামিয়ে দিয়ে এরপর আবার মাটি পাড়ে রেখে দেয়া হচ্ছে। খাল খননে মেলা টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আর যেভাবে খাল খনন করা হচ্ছে, তাতে অর্ধেক টাকাও খরচ হবে না। সামনে আসছে ধান কাটার ভরা মৌসুম। মাঠ থেকে ধান কাটার পর খালের পাড় দিয়ে কৃষকদের আসা-যাওয়া করতে হয়। খালের পাড়ে যেভাবে মাটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে ধানবোঝাই করে হেঁটে যাওয়া তো দূরের কথা, শুধু মানুষ হাঁটাই দায়।

চৌঁমুখা গ্রামের কৃষক রুবেল বলেন, কাজের মান একেবারেই খারাপ হচ্ছে। কোথাও মাটি কাটা হচ্ছে আবার হচ্ছে না। আমরা কিছু বললে আমাদের কথায় গুরত্ব দিচ্ছে না। যেন দেখার কেউ নেই।

আষ্টা বাজার ব্যবসায়ী মুন্নাসহ একাধিক ব্যবসায়ী জানায়, বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের নির্দেশনা অনুযায়ী দোকান মালিকের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন করে তাদের কাছে দিয়েছি।

এ বিষয়ে আষ্টা বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুর রহমান রহমত বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা।

এ বিষয়ে আষ্টা বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন পাটওয়ারী বলেন, আমি বাজারের কোন দোকান মালিকের কাছ থেকে দোকান উচ্ছেদের কথা বলে টাকা নেই নি। তিনি অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি যদি বলি সাংবাদিকরা এসে আমার কাছ থেকে ৫ হাজার নিয়েছে? তবে কোন সাংবাদিককে টাকা দিয়েছেন তা তিনি সুনির্দিষ্ট ভাবে না বলেই ফোন কেটে দেন।
বাজার কমিটির সহ-সভাপতি বাবুর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, উল্লেখিত বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সঠিক নয় বলে এড়িয়ে যায়।

এ বিষয়ে ৫ নং গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গনি বাবুল পাটওয়ারী বলেন, খাল সঠিক নিয়মে খনন করা হয়নি ও খালের উপর নির্মিত দোকান গুলো ভেঙ্গে দেওয়ার নাম করে ঠিকাদার ও স্থানীয় একটি মহল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আনি শুনেছি এবং উল্লেখিত বিষয়ে আমি ইউএনও মহোদয়কে অবগত করেছি।

খাল খনন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো.সাইফুল ইসলাম সরকার জানান, খাল খননের কাজ ডিজাইনে উল্লেখিত নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে। খাল পাড়ের গাছ গুলো সরকারি গাছ, কে বা কাহারা গাছ গুলো কেটে নিয়েছে, এ বিষয়ে আমি কিছুই যানিনা। আষ্টা বাজার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দোকান উচ্ছেদের নামে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি আমি অবগত নই। আমি ৫-৭ দিন পর পর কাজের স্থানে যাই এবং আমার লোক (ইসমাইল) এই কাজটি পরিচালনা করে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিউলি হরি বলেন, কাজের অনিয়মের বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করেছি এবং খনন কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।