৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  রাত ৩:৩০  ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরী
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

ফরিদগঞ্জে আলোচিত ফয়েজ হত্যা কান্ডের সাথে সম্পৃক্ত অটোরিক্সা উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিনিধি:

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে অটোরিক্সা চালক ফয়েজ খান হত্যার সাথে কে বা কারা জড়িত তা ক্রমশ: স্পষ্ট হচ্ছে। খুনের ঘটনার সিআইডি পুলিশের সন্দেহভাজন তালিকায় থাকা প্রবাসী মো: খোকন মিজির ছেলে পলাতক হাবিবুর রহমান হাসানের ভাড়াকৃত দোকান থেকে নিহত ফয়েজ খান এর অটোরিক্সাটি উদ্ধার হওয়ায় তার জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে। সেই জন্য রহস্য দ্রুতই উন্মোচন হওয়ার আশা করছে সিআইডি পুলিশ।

অটোরিক্সাটি উদ্ধার হওয়ায় ফয়েজ খান এর পিতা আ: লতিফ খান পুত্র হত্যার ঘটনায় জড়িতরা অচিরেই আটক করার পাশাপশি অটোরিক্সাটি ফিরে পেলে সংসারের টানাটানি থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়ার আশা করছেন।

এদিকে খুনের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের অন্যতম হাবিবুর রহমান হাসানকে দোকান ঘর ভাড়া নিতে সহযোগিতা করা দিনমজুর ফয়সাল পাটওয়ারী ও তার পরিবার আতংকে রয়েছেন। হাসানের পরিবারের লোকজন তাকে পবিত্র কুরআন শরীফ হাতে দিয়ে শপথ করানো এবং পরবর্তীতে তাকে মামলায় জড়িয়ে দেয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি তাকে আতংকগ্রস্থ করেছে। তবে ইতিমধ্যে সিআইডি পুলিশ ফয়সালের জবানবন্দি গ্রহণ করেছে।

যেভাবে উদ্ধার হলো অটোরিক্সাটি:

পেশায় দিনমজুর ফয়সাল পাটওয়ারী চররাঘবরায় গ্রামের সোলায়মান পাটওয়ারীর ছেলে। চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে চররাঘবরায় গ্রামে একটি নির্মিতব্য ভবনে একত্রে হাসানের সাথে সহযোগি হিসেবে ইলেকট্রিক কাজ করে ফয়সাল। কাজ করার সময়ই হাসান ফয়সালকে এলাকায় কোনো দোকানঘর খালি বা ভাড়া নেয়ার মতো আছে খোঁজ নিতে বলে। এমন প্রস্তাবে ফয়সাল জানায় তার মামার বাড়ির অপর এক মামার দুটি দোকানঘর খালি পড়ে আছে। পরে হাসান তাকে দোকানঘর ভাড়ার জন্য কাজ করতে বলে। সে হিসাবে ফয়সাল খোঁজ নিয়ে দোকান মালিক প্রবাসী মজিবুর রহমান মজুর সাথে মোবাইলে হাসানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর হাসান ৫ হাজার টাকা জামানতে ফেব্রুয়ারীর প্রথম থেকে ঐ দোকান ঘরটি ভাড়া নেয়। কিন্তু হাসান দোকান না খুলে এবং তিন মাসের ভাড়া পরিশোধ না করায় দোকান মালিক চলতি মাসের ৩ মে ফয়সালকে চাপ প্রয়োগ করে।

এরপর ফয়সাল দোকানের মালিকের স্ত্রী লাকী বেগমের সাথে কথা বলে জানতে পারে, ভাড়াটিয়া হাসানের দোকানের তালার একটি চাবি লাকী বেগমের কাছে রয়েছে। ওই চাবি নিয়ে ফয়সাল দোকানটি খুলে দেখতে পায় দোকানের ভিতরে একটি অটোরিক্সা রয়েছে। পরে বিষয়টি সে তার প্রবাসী মামা ও বাড়িতে থাকা মামীকে জানায়। পরে হাসানের বাড়ীতে গিয়ে তার পরিবারকে ভাড়া পরিশোধ বা মালামাল নিয়ে দোকান খালি করার জন্য বলে আসতে বলে। ফয়সাল সেই মোতাবেক ওই দিনই হাসানের বাড়ি গিয়ে তার মা হাছিনা বেগমকে দোকান ভাড়া নেয়া ও দোকানের ভিতর অটোরিক্সা থাকাসহ সকল বিষয় জানায়। হাসানের মা সাথে সাথে ফয়সালকে নিয়ে তার এক নিকাটাত্মীয়ের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে এক পর্যায়ে অটোরিক্সার বিষয়টি জানাজানি না করতে ফয়সালকে চাপ প্রয়োগের এক পর্যায়ে হাতে পবিত্র কুরআন শরীফ দিয়ে শপথ করায়। হাসানের মা হাছিনা বেগমও দু-একদিনের মধ্যে দোকানের ভাড়া পরিশোধ করে অটোরিক্সাটি সরিয়ে দোকান খালি করে দিবে জানান। এরপর সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ায় এবং পবিত্র কোরআন শরীফ ফয়সালকে হাতে নিয়ে শপথ করানোয় তার ভেতরে সন্দেহের সৃষ্টি হতে থাকে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো ঝামেলা রয়েছে। তাই সে বারংবার হাসানের মা হাছিনা বেগমের বাড়ীতে গিয়ে ও মোবাইল ফোনে তাগিদ দিতে থাকে। একপর্যায়ে ফয়েজ খান এর এলাকার এক জনপ্রতিনিধি অটোরিক্সার বিষয়টি অবহিত হন। পরবর্তীতে ফয়েজের পিতা আ: লতিফ খান জানতে পেরে গোবিন্দপুর গ্রামের গাজী বাড়ির সামনে হাসানের ভাড়াকৃত দোকানে থাকা অটোরিক্সাটি ফয়েজের বলে সনাক্ত করেন। অত:পর সংবাদ পেয়ে সিআইডি পুলিশ উক্ত স্থান থেকে গত ২০ মে বৃহস্পতিবার রাতে অটোরিক্সাটি উদ্ধার করে। স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, ফয়সাল একজন সহজ-সরল ছেলে। অত্র এলাকায় তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার খারাপ কোনো অভিযোগ নেই। ইতিমধ্যে সিআইডি পুলিশও ফয়সাল কিভাবে দোকানঘরটি ভাড়া নিতে হাসানকে সহযোগিতা করেছে সেই জবানবন্দি গ্রহণ করেছে।

উল্লেখ্য, গত ১ এপ্রিল উপজেলার গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের লামচর গ্রামের কালী গাছতলার পাশে জনৈক শিপন দাসের পরিত্যক্ত ঘর থেকে ফয়েজ খানের বিকৃত লাশটি উদ্ধার করে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ। ঐ রাতেই গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের ধানুয়া গ্রামের ফয়েজ খানের পিতা লতিফ খান বাদী হয়ে অজ্ঞাত নামা আসামী করে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ফয়েজ খান উপজেলার লতিফ খানের একমাত্র ছেলে।

এর আগে ২৮ মার্চ সে তার অটোরিক্সাটি নিয়ে বাড়ী থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। এর পরদিন তার বাবা ফরিদগঞ্জ থানায় একটি নিঁেখাজ ডায়েরী করেন। এরপর ১ এপ্রিল ঐ স্থান থেকে হাত-পা বাঁধা অর্ধগলিত ও বিকৃত লাশের সন্ধান পায় পুলিশ। পরে লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের লোকজন তার পরিধেয় গেঞ্জি, প্যান্ট ও জুতা দেখে লাশটি ফয়েজের বলে সনাক্ত করেন।

এদিকে, লাশটি উদ্ধারের পর ফরিদগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি ও পিবিআই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ছায়া তদন্ত শুরু করে করে। এরই একপর্যায়ে সিআইডি পুলিশ মোবাইল ফোন ট্রাকিং করে হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে পাশ^বর্তী হাইমচর উপজেলা থেকে বোরহান নামে এক যুবককে আটক করার পর মামলাটির তদন্তভার তারা গ্রহণ করে।

এব্যাপারে চাঁদপুরের সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক আবু জাহের সরকার মুঠোফোনে জানান, ইতিমধ্যেই আমরা নিহত ফয়েজ খান এর অটোরিক্সাটি উদ্ধার করেছি। ক্রমশ: হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে এগিয়ে চলছি। আশা করছি দ্রুত রহস্য উদঘাটন হবে।